চলুন গনগনি
করোনা বিধ্বস্ত পৃথিবীতে আমরা হারিয়েছি অনেক বন্ধু পরিজনদের। ভরসা হয়নি কোথায়ও যাই। মন পাখি যে বড়ই অবুঝ। এই অবাধ্য মনটাকে নিয়ে এই দশ মাস ছাদ আর ছাদ বাগানটাকেই বিশ্বজগৎ তৈরি করে ঘুরিয়ে ছিলাম। মন পাখি যেই না 2021 এর গন্ধ পেলেন অমনি তিনি উড়ুউড়ু। বলেন কিনা

” থাকবো নাকো বদ্ধ ঘরে
দেখবো এবার জগৎটাকে…”
তাই আজ জং ধরা শরীরের আড়মোড়া ভাঙ্গতে বেরিয়ে পড়লাম। উদ্দেশ্য “বাংলার গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন” গনগনি।

বছরের প্রথম দিনেই দুই বন্ধু পরিবার গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। পথে যেতে যেতে বন্ধুত্ব করে নিলাম দামোদর, মুন্ডেশ্বরী,দ্বারকেশ্বর এই তিন নদ নদীর সাথে। তারপর বনলতার বিথীকা, জয়পুর জঙ্গল, বিষ্ণুপুরকে ছুঁয়ে পৌঁছলাম গড়বেতার গনগনিতে।
মাঝে কাজু বনের বুক চিরে যখন পৌঁছলাম গনগনিতে তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল। এখানে নদীর পাড়ে বেড়ানোর সেরা সময় ভোরবেলায় আর সূর্যাস্তের সময়। লাল পাথুরে মাটিতে ছোট ছোট টিলা বেয়ে এই ক্যানিয়নে বেড়াতে মন্দ লাগবে না।
কি দেখবেন?
গাড়ি থেকে নেমে সিঁড়ি বেয়ে নেমে যাওয়া অন্য জগতে। শিলাবতী নদী পাড়ের ভাস্কর্য প্রকৃতি তৈরী করেছে বাতাস ও জলের ক্ষয়কার্যে।

নদী পাড় ক্ষয়ের ফলে ল্যাটেরাইটে তৈরি হওয়া অদ্ভুত সুন্দর প্রাকৃতিক ল্যান্ডস্কেপ দেখতে দূরদূরান্ত থেকে পর্যটকরা ছুটে আসে। সৃষ্টিকর্তা আরও অকৃত্রিম ভাবে উজাড় করে দিয়েছেন গিরিখাতে হরেক রকম লাল হলুদের শেড, সাথে সবুজ গাছের জংগল, গাঢ় নীল আকাশের প্রেক্ষাপটে। সাথে বাঁধন ছাড়া ছোট্ট মেয়ের মতো এঁকে বেঁকে চলা নদী শিলাবতী, যার ডাক নাম নাকি শিলাই। এখন শিলাইতে হাঁটু জল।

“আমাদের ছোট নদী চলে আঁকে বাঁকে
বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে…”
বর্ষায় নাকি দুরন্ত হয়ে ওঠে।
নদীর একদিকে তীর বরাবর লাল মাটির খাদ। প্রকৃতি আপন খেয়ালে বানিয়েছে অসংখ্য ভাস্কর্য, গুহা। লোককথা — এই জায়গাতেই নাকি বকাসুর কে বধ করেছিলেন ভীম। আর ক্যানিয়নের গুহার মতো জায়গাগুলোতে পান্ডবরা ছিলেন। তাই গুহা গুলোকে পান্ডব গুহা বলে। রোদে এখানকার মাটি টকটকে লাল হয়ে ওঠে যা দেখতে উনুনের আঁচের মতো গনগনে। তাই হয়তো তার নাম ‘ গনগনি ‘।

দিগন্তরেখায় নদী আর আকাশ মিশে একাকার। সাথে গাঢ় নীল আকাশ, গিরিখাতে হরেক রঙের শেড, তার ওপর সবুজ ঘাসের কার্পেট, শিলাইয়ের গেরুয়া জল, হলুদ বালুতটের দুপারে সবুজের ঘেরা টোপ। প্রকৃতি প্রেমী আর ছবি শিকারীদের কাছে স্বর্গরাজ্য।

শাল পিয়ালের জংগলে ভরা এই গনগনিকে রূপকথার রাজ্য ভাবতে ভালোই লাগে। এখানে এক দিনেই ঘুরে আসা যায়। কেউ চাইলে থাকতেও পারেন। ছোট বড় অনেক হোটেল ও ধর্মশালা আছে। আসে পাশে অনেক মন্দির ও ঘুরে দেখা যায়।
ভারতে অন্য যে সব গিরিখাত বা ক্যানিয়ন আছে, তার মধ্যে
অন্ধ্রপ্রদেশের গান্ধীকোটা ও পাপি হিলস, মেঘালয়ের লাইটলাম, রাজস্থানের চাম্বাই, লাদাকের জাস্কর ভ্যালি, হিমাচল প্রদেশের স্পিতি ভ্যালি নামকরা।




85712075 – gandikota wall and great canyon view 
এবার পৌঁছে যাই কল্পনার জগতে। আমেরিকার গ্র্যান্ড ক্যানিয়নকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা। আ্যরিজোনার জায়গায় গনগনি, আর কলোরাডোর জায়গায় শিলাবতী নদী। এভাবে শিলাইয়ের তীরে দাঁড়িয়ে কল্পনার রাজ্যে ভেসে বেড়াই। সাথে আনন্দ মজা লুটেপুটে নিয়ে ফিরে এলাম।

সবশেষে মন খারাপের কথা বলি। এখানে পিকনিকে আসা মানুষদের কারনে, জমছে প্লাস্টিক, থার্মোকলের থালা বাটি, যেখানে সেখানে ফেলে নোংরা করছে জায়গাটি। এত সুন্দর একটি জায়গায় এরকম পরিবেশ দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেল। স্থানীয় প্রশাসনের কাছে অনুরোধ অবিলম্বে এই জায়গাকে “প্লাস্টিক ফ্রি জোন” হিসাবে ঘোষনা করা হোক। তবেই বাঁঁচবে পরিবেশ, বাঁচবে সৌন্দর্য্য, বাঁচবে গনগনি।
কি ভাবে যাবেনঃ
হাওড়া থেকে NH6 ধরে বাগনান হয়ে উলুবেড়িয়া, তারপর ঘাটাল হয়ে চন্দ্রকোনা রোড অথবা শালবনি থেকে চন্দ্রকোনা রোড। সেখান থেকে অল্প দুরত্ব। এ ছাড়া আরামবাগ থেকেও যাওয়া যায়। হাওড়া থেকে খড়গপুর হয়ে গেলে ১৫০ কিলোমিটার রাস্তা হবে, আর বালী থেকে আরামবাগ হয়ে ধাদিকা হয়ে গেলে দুরত্ব পড়বে ১২৫ কিলোমিটার। সহজেই এক দিনে গিয়ে চলে আসা যায়।
নিকটবর্তী রেল স্টেশান গড়বেতা। সেখান থেকে গনগনির দূরত্ব মাত্র ৪ কিলোমিটার। অনেক ট্রেন গড়বেতে যায়।
গনগনি নিয়ে বিস্তারিত দেখতে ভিডিও দেখুন
লেখিকাঃ কৃষ্ণা রায়







