Daringbari

Full Guide of Daringbari Tour: দারিংবাড়ি ভ্রমণের ফুল গাইড

Forest Adventure Hill station Orissa

দারিংবাড়ি ভ্রমণের ফুল গাইড : Full Guide of Daringbari Tour

সম্প্রতি বাঙ্গালীদের কাছে দাড়িংবাড়ি নামটি পরিচিত হয়ে উঠেছে। দীঘা বা পুরী একঘেয়ে হয়ে গেছে- তাই আরো একটু দূরে, অন্যরকম কোথাও যেতে চাইছে সবাই। সেই সূত্রে উঠে এসেছে দাড়িংবাড়ির নাম। আর ইউটিউবারদের সৌজন্যে এখন ‘উড়িষ্যার কাশ্মীর’ বলে চলছে দাড়িংবাড়ির প্রচার। আই আরও সবাই ছুটছে কাশ্মীর না গিয়ে কাশ্মীর দেখতে।

এই প্রতিবেদনে আমি এই ২০২১ সালের নভেম্বরের দাড়িংবাড়ির একটি সামগ্রিক ভ্রমণ চিত্র দেখানোর চেষ্টা করব। কতদিনের ভ্রমণ, কিভাবে যাবেন, খরচপাতি, ইত্যাদি।

প্রথমেই বলে নেওয়া ভাল, দাড়িংবাড়ি কাশ্মীর নয়। সেই আশা নিয়ে গেলে আপনি হতাশ হবেন, কিন্তু তার আশেপাশে যে সব দ্রষ্টব্য আছে, তা দেখে নিশ্চয়ই আপনি মুগ্ধ হবেন, হলপ করে বলতে পারি।

তার আগে আপনি ট্যুর প্লান করে নিন, দাড়িংবাড়িতে বা আসা-যাওয়ার পথে আপিনি কি কি দেখবেন। আমি একটা ট্যুর প্লান দিচ্ছি, আসা বা যাওয়ার দিন অদল বদল করতে পারেন, তবে রুট একই রাখতে হবে।

কি কি দেখবেন ?

প্রথম দিন –

১। সারদা ড্যাম

২। ঘন্টেশ্বরী মন্দির

৩। রুসিকুইল্যা নদী-

৪। সানসেট পয়েন্ট

দাড়িংবাড়ি হোটেলে রাত্রি যাপন

দ্বিতীয় দিন-

৫। মন্দাসুরু নেচার পার্ক

৬। লাভার্স পয়েন্ট

৭। এমু পাখী ফার্ম

৮। দাড়িংবাড়ি নেচার পার্ক

৯। দাড়িংবাড়ি হিল ভিউ পার্ক

১০। দাড়িংবাড়ি কফি গার্ডেন

১১। দাড়িংবাড়ি পাইন ফরেষ্ট

দাড়িংবাড়ি হোটেলে রাত্রি যাপন

শেষ দিন, ফেরার পথে

১২। মিদুবান্দা জলপ্রপাত

১৩। খাসাদা জলপ্রপাত

১৪। জিরাঙ্গা বৌদ্ধিক মনাস্ট্রি

১৫। তপ্তপানি

১৬। তপ্তপানি ডিয়ার পার্ক

কোন সময়ে যাবেন?

সেপ্টেম্বর থেকে মার্চ সঠিক সময়। তবে যে কোন সময়েই ঘুরে আসতে পারেন।

কি ভাবে যাবেন, কখন যাবেন?

শুরু করুন হাওড়া থেকে। আপনাকে নামতে হবে ব্রাহ্মপুর স্টেশানে। যেহেতু ট্রেনের সময়-সূচী পরিবর্তনশীল, তাই বিশেষ কোন ট্রেনের নাম বলছি না। তবে হাওড়া থেকে দাড়িংবাড়ি যেতে সময় লাগে সাড়ে ৮ থেকে ১০ ঘন্টা। এমন কোনও ট্রেন ধরুন যাতে রাত ১১ টার পরে হাওড়া থেকে  ট্রেনে উঠে পরের দিন সকাল ৯ টার মধ্যে ব্রহ্মপুর নামা যায়। এমন বেশ কয়েকটি ট্রেন আছে।

আগে থেকে হোটেলের মাধ্যমে গাড়ি বুক করে নিতে পারেন, তবে ভাড়াটা একটু বেশি পড়বে। কিন্তু চিন্তা কম থাকবে।

অথবা, ব্রহ্মপুরে গিয়ে গাড়ি বুক করে নিন দুই দিনের জন্যে, কারণ সমস্ত সময়টাই আপনাকে গাড়িতে ঘুরতে হবে। ৪৫০ কিলোমিটার ভ্রমণ করতে হবে, বোলেরো বা টাটা সুমো নিলে ১৫-১৬ টাকা কিলোমিটার পড়বে। গাড়ি হিসাবে বা তেলের দামের উপর নির্ভর করে দাম কম-বেশি হতে পারে। হোটেলের মাধ্যমে বুক করলে ১০-১২০০০ টাকা পড়বে।

গাড়িতে উঠে একটু এগিয়ে গিয়ে রাস্তার উপরেই টিফিন খাওয়ার রেস্টুরেন্ট আছে, খেয়ে নিন। আর সাথে নিয়ে নিন শুকনো খাবার, যা গাড়িতে যেতে যেতেই খাওয়া যায়।

শুরু হল আপনার যাত্রা। যেহেতু রাতে ভাল ঘুম নাও হতে পারে, তাই প্রথম দিনেই অত ধকল নেবার দরকার নেই।

প্রথম দিনে

আপনি এগুলোই দেখবেন, যা দাড়িংবাড়ি যাওয়ার পথেই পড়ে। আপনি দেখবেন-

১। সারদা ড্যামঃ

Sarada Dam
Sarada Dam

ব্রহ্মপুর থেকে দূরত্ব ৭৫ কিলোমিটার। ঢুকেই একটি বড় চাতাল, গাড়ি রাখার যায়গা। এখানে নদীতে ড্যাম বানিয়ে জল আটকে রাখা হয়েছে। চারিদিকে পাহাড়ে ঘেরা, মাঝে ড্যাম। বানানো হয়েছে মন্দির, ওয়াচ টাওয়ার। ওয়াচ টাওয়ার অনেকটাই উঁচু। তিনটি ধাপ আছে। একেবেরে উঁচু ধাপে উঠে চারিদিকে দেখলেই আপনার মন ভরে যাবে।

Sarada Dam 2
Sarada Dam 2

চারিদিকে বিস্তীর্ণ জলাভুমি বা জমে থাকা ড্যামের জল, তার অদূরে পাহাড়-শ্রেনী, আর অন্যদিকে অনেক দূরে নীচে পাহাড়ের কোলে শহরের বা কোন গ্রামের ঘর-বাড়ি।

Sarada Dam3
Sarada Dam 3

দার্জিলিংকে মনে করিয়ে দেবে। ছবির মত যায়গা। অনেক্ষণ কাটিয়ে দেওয়া যায় এখানে। আর সেলফি আর ফটোস্যুটের ব্যপারে তো কোন কথাই হবে না।

২। ঘন্টেশ্বরী মন্দির-

Ghanteswari Mandir
Ghanteswari Mandir

সারদা ড্যামের বড় চাতালের একপাশে একটি টিলা, তার উপরেই ঘন্টেশ্বরী মন্দির। মন্দিরে ওঠার ও নামার সিঁড়িটি বেশ সাজানো, উঁচু বেশি নয়, কিন্তু লম্বা অনেকটা। মন্দিরে উঠে নীচু ছাদ, বসার চাতাল আছে। ওখানে এক পুজারী আছে, নিত্য পূজ হয়। ঘন্টা বাজানো হয়। মন্দিরের সামনে একটি সিমেন্টের তৈরি সাদা শঙ্খ বানিয়ে রাখা হয়েছে।

Stairs of Ghanteswari Mandir
Stairs of Ghanteswari Mandir

তার পাশে আরও একটি সিঁড়ি। সেখানে নামলে রাস্তার উপর থেকে দেখা যায় নদী এবং ড্যামের কিছু অংশ। এ ছাড়া চারিদিকেই উঁচু পাহাড়, সবুজ প্রকৃতি, তার নীচে ছোট ছোট ঘর-বাড়ি। আর রসিকুইল্যা নদী। যে নদীতে বাঁধ দিয়ে ড্যাম বানানো হয়েছে। এখানে বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকলে ঠান্ডা ছায়ায় শরীরের ক্লান্তি কাটবে অনেকটাই। ট্রেনে এবং তারপরে এই ৭৫ কিলোমিটার রাস্তার ক্লান্তি কেটে যাবে।

৩। রুসিকুইল্যা নদী-

Rushikuliya River
Rushikuliya River

এই নদীর উপর বাঁধ দিয়ে বানানো হয়েছে ড্যাম। উপর থেকেই দেখা যায়, এঁকে বেঁকে চলে গেছে এই নদী। আলাদা দ্রষ্টব্য হিসাবে না দেখে ড্যামের অঙ্গ হসাবে দেখাই ভাল। তবে ড্যামে যাওয়া আসার পথে কিছুটা পথ চলে গেছে নদীর পাশ দিয়ে। ছোট নদী। তবুও ইচ্ছা এবং সময় হলে গাড়ি দাঁড় করিয়ে নদী দেখে নেওয়া যায়।

এবার আপনার গন্তব্য হোটেল। দাড়িংবাড়িতে। যা আগে থেকেই ঠিক করা আছে। যদি না ও থাকে, গিয়ে ঠিক করে নিতে পারেন। কিন্তু, যেহেতু দাড়িংবাড়িতে বেশি হোটেল নেই, সিজনের সময় আগে বুকিং না করলে হোটেল না ও পেতে পারেন।

সারদা ড্যাম থেকে দাড়িংবাড়ির দূরত্ব ৫০ কিলোমিটার। সময় লাগবে একঘন্টার কিছু বেশি।  তবে রাস্তা ভাল, দু’পাশের উঁচু নীচু পাহাড়ি রাস্তা ও জঙ্গল দেখতে দেখতে চলে যান। রাস্তার কোনও কোনও বাঁক পেরোতে গিয়ে আবার যে কোন পাহাড়ি এলাকা বা দার্জিলিং বা কালিম্পঙ্গের কথা মনে পড়বে। হোটেলে পৌঁছে যাবেন দুটোর মধ্যে।

হোটেলে গিয়ে স্নান করে নিন। তারপর খেয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে আরও ফ্রেস হয়ে নিন। তারপর চলে যান সানসেট পয়েন্টে। এক/ দুই কিলোমিটার দূরে। সিজন অনুযায়ী সময় দেখে নিন।

৪। Sunset Point –

Sunset Point, Daringbari
Sunset Point, Daringbari

দাড়িংবাড়ি থেকে বেশি দূরে নয়। পাহাড়ের নীচে সূর্য্য ডুবে যাচ্ছে, এই দৃশ্য দেখার জন্যে পর্যটকরা আগে থেকেই গিয়ে ভিড় জমায়। তবে করণার আগে যেহেতু লোক সমাগম বেশি ছিল, এখানে তাই বেশ কয়েকটি দোকান ও ছিল। তাদের তৈরি করা বাঁশের বেঞ্চ পাতা আছে। অনেকটা গ্যালারির মত।

Sunset at Sunset point  Daringbari
Sunset at Sunset point Daringbari

সেখানে বসে সূর্যাস্ত দেখতে পারেন। অথবা রাস্তায় দাঁড়িয়ে। বেশ কয়েকটু উঁচু-নীচু পাহাড় সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার উপরে সূর্য্য, আস্তে আস্তে নীচে নেমে চলে যাচ্ছে পাহাড়ের অন্য পাশে লাল রঙ ছাড়িয়ে- অপূর্ব দৃশ্য। তা ছাড়াও এই এলাকার চারিদিকেই পাহাড়। তার মধ্যে দিয়ে একটি পিচ ঢালা সুন্দর রাস্তা নেমে গেছে। রাস্তা থেকে নীচে তাকালে দেখা যায় একটি চাতালের মত এলাকা। সেখানে দুটি বড় বড় বিল্ডিং। দাড়িংবাড়ি রিসর্ট।

সূর্যাস্ত দেখার পর আর কোন কাজ নেই এ দিন। এবার হোটেলে ফেরা। আসার পথে দাড়িংবাড়ি বাজার দেখতে দেখতে আসুন। মাঝারি শহর। দরকারি সব জিনিস পাওয়া যায়। তবে খুব স্পেশাল কিছু পাওয়া যায় না।

দাড়িংবাড়ি পাহাড়ি এলাকা। চাষবাস খুব কম। তার মধ্যে যেটুকু হয়, অনেক জমিতেই হলুদ চাষ হয়। অনেক হলুদের ক্ষেত। এই মাটিতে হলুদ ভাল হয়। আর এখানে চাষ হয় গোলমরিচ, কোথাও দারচিনি। তাই এখানে যারা আসে, তারা কিছুটা হলুদ বা গোলমরিচ নিয়ে যায়। ‘কসম’ বলে একটি কো-অপারেটিভ আছে, তারা গ্রামের চাষীদের কাছ থেকে এগুলো কিনে প্রসেসিং করে প্যাকেট করে তাদের দোকানে বিক্রি করে। গোলমরিচ ৮০০ টাকা কিলো। হলুদ ১২০ টাকা। সানসেট দেখে আসার পথে এই দোকান থেকে হলুদ, দারচিনি, গোলমরিচ ও অন্য মশলা কিনে নেওয়া যেতে পারে।

তারপর হোটেলে এসে চা খাওয়া, গুলতানি মারা। হোটেলের ব্যলকনিতে বসা। Hotel Mid Town  এর সামনে বসলে সামনে থেকে পাহাড় দেখা যায়। রাতে তার মধ্যে জ্বলে ওঠে কিছু আলোক বিন্দু। মানে ওর মধ্যে কোথাও লোকের বসতি আছে। সময় থাকলে দিনে গিয়ে খুঁজে নিতে পারেন খানিকটা পাহাড়ে উঠে। তারপর রাতে খেয়ে ঘুম।

দ্বিতীয় দিন-

সকাল আটটার মধ্যে বেরোলেই হবে। প্রথম যাত্রা মন্দাসুরু ইকো ট্যুরিজম সেন্টার।

৫। MNDASARU ECO TOURISOM CENTRES:

দাড়িংবাড়ি থেকে দূরত্ব ৩৫ কিলোমিটার। একটি পাহাড়ি এলাকা ঘিরে পার্ক করা হয়েছে। অনেক ফুলের গাছ আছে, আছে লম্বা লম্বা পাইনের গাছ। তার মধ্যে আছে ওয়াচ টাওয়ার আর একটি পাহাড়ি গুহার আদলে ছোট মন্দির। আর এখানে থাকার জন্যে আছে কয়েকটি কাঠে তৈরি কটেজ। প্রতিটি কটেজই দেখতে খুব ভাল। দুটি করে রুম আছে। প্রতি রুমে ডাবল বেড। থাকার ভাড়া দিনে ৩৫০০ টাকা প্রতি রুমের জন্যে। খাওয়া আলাদা। রান্না করে দেওয়ার মহিলারা আছে, পছন্দ অনূযায়ী সব কিছু রান্না করে দেবে, দাম আলাদা। প্রতিটি কটেজ থেকে পাহাড় দেখা যায়, শোনা যায় ঝর্নার জল পড়ার শব্দ।

Midubanda Eco Tourism Centre
Midubanda Eco Tourism Centre

তবে সেখানে পৌঁছানো যায় না। পাহাড় দেখতে হবে ওয়াচ টাওয়ার থেকে। পাহাড় দেখতে দেখতে মনে পড়বে শিলংকে। ওয়াচ টাওয়ারের নীচেই কয়েকজন মহিলা বসে থাকে, মুড়ি মেখে দিতে পারে, চা বা কফি করে দিতে পারে। চা/ কফি বা মুড়ি খেতে খেতে ওয়াচ টাওয়ারে বসে পাহাড় দেখুন। চা দশ টাকা আর কফি ২০ টাকা। তারপর নেমে আসসুন পাইন গাছের মধ্যে। সেখানে দোলনা পেতে রাখা আছে। খানিকটা দোল খেয়ে নিন। প্রাকৃতিক দৃশ্য তো আছে, এ ছাড়া আছে অনেক পাখী। যারা পাখীর ছবি তুলতে ভাল বাসেন, তারা ক্যামেরা রেডি রাখুন। শুধু এখানেই নয়, সারা দাড়িংবাড়িতে অনেক পাখী পাবেন, অনেক সহজে। এবার গন্তব্য লাভার্স পয়েন্ট

৬। Lovers’ point:  

Lovers Point
Lovers Point

মনদাসরু থেকে ৩৪ কিলোমিটার। ঘন্টা খানেক লাগবে। ডুড্ডূবেডাং বলে একটি পাহাড়ি নদী আছে। সেই নদীর জল উঁচু নীচু পাথর পারিয়ে বয়ে চলেছে কল কল করে। আছে কিছুটা সমতল পাথরের উপত্যকা। এটাই লাভার্স পয়েন্ট। কে বা কেন এই নাম, কেঊ জানেনা। হতে পারে পর্যটন বিভাগের দেওয়া নাম। তবে নাম যে ই দিক, যায়গাটা খুব ভাল। নদীর উপরের দিকে জল বেশ কিছুটা গভীর, এখানে এসে পাথরের উপর দিয়ে বয়ে চলেছে।

Lovers Point
Lovers Point

জলের নীচে পাথর দেখা যায়, কিন্তু এত খরশ্রোতা, কারও পক্ষেই সেই দশ-বারো ফুট নদী পেরোনোই বোধ হয় সম্ভব নয়, ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। এখানে কিছুক্ষণ সময় কাটানো যায়। তার পাশ দিয়ে পায়ে চলা সরু রাস্তা ধরে একটু এগিয়ে গেলে বাঁদিকে পাহাড়ের অনেকটা উপরে আছে একটি গুহা। এখন জনসমাগম কম বলে সেখানে কেঊ যায় না বা জানেও না অনেকে। আমরা জানলাম স্থানীয় একজন লোকের কাছথেকে। দূর থেকে দেখলাম গুহার মুখ, কিন্তু জঙ্গল পেরিয়ে যাওয়ার সাহস হল না। গুহার পাশে আছে অনেক হনুমান, বাঁদর।

৭। EMU BIRD FIRM:

এখান থেকে বেশি দূরে নয়- কাছেই, রাস্তার উপরে ব্যক্তিগত ভাবে কেউ করেছে। পাহাড়ের কোলে যায়গা আছে অনেকখানি। তার একটি এলাকা জুড়ে রাখা আছে কয়েকটি এমু পাখি। আর তার পাশে লোকের থাকার জন্যে করা হয়েছে কয়েকটি তাবু। প্রতিটির ভাড়া ২৫০০-৩০০০ করে দিনে। খাবার খরচ আলাদা। তবে কাউকেই থাকতে দেখিনি। এখানে আবার জনপ্রতি ২০ টাকা এন্ট্রি ফি আছে। গাড়ি রাখার জন্যে ৩০ টাকা। কিন্তু ভিতরে গিয়ে পয়সা উশুল হয় না। দেখার মত কিছু নেই। যারা এমু পাখী দেখেননি, তারা যেতে পারেন।

এবার হোটেলে ফেরার পালা। আবার সেই সুন্দর রাস্তা ধরে ফেরা। কোথাও সমতল, কোথাও উঁচু-নীচু, কোথাও পাহাড়ি বাঁক, কোথাও জঙ্গল, কোথাও গ্রাম পেরিয়ে ফিরে আসা। এই রাস্তা ধরে চলাটাই একটা ভ্রমণ। অনেক কিছু দেখা হয়ে যায়। মন ফ্রেশ হয়ে যায়।

হোটেলে এসে স্নান করে খেয়ে একটূ বিশ্রাম করে আবার বেরিয়ে পড়তে হবে। বেশি দেরি করা যাবেনা, শীতের দিনে সূর্য্য আগে ডোবে। তার মধ্যেই দেখে নিতে হবে অনেক কিছু। তিনটের মধ্যে বেরিয়ে পড়াই ভাল। প্রথমে কফি গার্ডেন।

৮। Coffee garden:

কফি গার্ডেন না বলে একে গোলমরিচের বাগান বলা ভাল। এন্ট্রি ফি জনপ্রতি ১০ টাকা। বড় রাস্তার পাশে অনেকখানি এলাকা জুড়ে ঘিরে লাগানো হয়েছে কফি গাছ এবং উঁচু, লম্বা পাইন গাছ। কফি গাছ বেশি বড় হয় না, জবাফুলের গাছের সাইজের গাছ, সেখানে ডালে ডালে থোকা থোকা কফি ফল ধরে আছে। কাঁচা অবস্থায় সবুজ, পাকলে লাল হয়ে যায়। আর আছে গোলমরিচের গাছ। লতার মতো প্রতিটি পাইন গাছ জড়িয়ে উঠে গেছে অনেক উঁচুতে। সেখানে থোকা থোকা গলমরিচ ঝুলছে। কাঁচা অবস্থায় রঙ সবুজ, পেকে গেলে কালো। আর আছে গাছে গাছে অনেক পাখী, বাঁদর। খুব উঁচু গাছ, তাদের মগডাল পেরিয়ে এ গাছ থেকে ও গাছে চলছে তাদের ছুটোছুটি। রাস্তার পাশে বিক্রি হচ্ছে গোলমরিচ। ১০০০ টাকা কিলো। বাজারের চেয়ে দাম বেশি। তার উলটো দিকেই পাইন ফরেষ্ট।

৯। পাইন ফরেষ্টঃ

Pain Forest, Daringbari
Pain Forest, Daringbari

তেমন কিছু নয়। অনেকদিন আগে লাগানো হয়েছে গাছ গুলি, তাই অনেক বড় হয়ে গেছে। ভিতরে যাওয়ার সরু রাস্তা। একটু এগিয়ে পায়ে চলা চৌরাস্তা। ডাইনে বাঁয়ের রাস্তার একদিনে পাইন গাছ, অন্য দিকে পাল্লা দিয়ে উঁচু হয়ে গেছে তেল চকচকে সাদা গুড়ির ইউক্যালিপটাস গাছের সারি। সবই লাগানো হয়েছে একসময়। এখন ফরেস্টের মত হয়ে গেছে। কিছুটা এগিয়ে নদী। তার চিহ্ন দেখিনি। চাষ করে ফসল বোনা হয়েছে সেখানে। তবে কোথাও ক্ষীণ জলের ধারা আছে। সেখনে স্থানীয় বৌ-ঝিরা বাসন মাজে।  এখানে ফটো তুলে ঘুরে চলুন পার্কে।

কফি গার্ডেন থেকে পাঁচ কিলোমিটার। দিন থাকতে যেতে হবে। সাতটায় বন্ধ হয়ে যায়। সাড়ে পাঁচটায় আলো কমে যায়। নেচার পার্ক আর হিলভিউ পার্ক মুখোমুখি.

১০। নেচার পার্কঃ

এখানেই আগে ঢোকা ভাল। বেশ বড় পার্ক। অনেক যায়গা ঘিরে প্রাকৃতিক পার্ক করা হয়েছে। এখানে যেমন বানানো হয়েছে গ্রামের স্থানীয় মানুষের মাটির বাড়ি, তেমনি তাদের প্রমান সাইজের মুর্তি করে রাখা আছে, অনেকেই তাদের সাথে দাঁড়িয়ে বা বসে ছবি তোলে। আছে প্রচুর ফুল গাছ। আর সেই গাছে প্রচুর ফুল। এর মধ্যে একটি ফুলবাগান এলাকার নাম দেওয়া হয়েছে ‘বাটারফ্লাই পার্ক’। এখানে হয়ত ফুলে ফুলে প্রজাপতি ঘুরে বেড়ায়, কিন্তু আমাদের যেতে সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় আমরা একটাও প্রজাপতি দেখিনি। তবে ফুল দেখেছি অনেক। একটি স্থানে বেদী বানিয়ে মহর্ষী চরকের মুর্ত্তি বসানো হয়েছে। ভেষজ গাছ গাছালি আছে হয়তো। আর আছে একটি অর্কিড হাউস। অর্কিড হাউসটি খুলেছে এই অক্টোবরে। করোণার জন্যে বন্ধ ছিল। সেখানে অনেক অর্কিড আছে, তবে বেশিরভাগই ডেনড্রোবিয়াম ও ফেলিওনপ্সিস জাতের। কিছু ক্যাটেলিয়া আছে। অন্য ভ্যারাইটি কম আছে। এখানে ফুল দেখে ছবি তুলতে বেশ কিছু সময় কাটিয়ে যেতে হবে উল্টোদিকের হিল ভিউ পার্কে।

১১। হিল ভিউ পার্কঃ

এখানে আলাদা প্রবেশমূল্য লাগবে। ১০ টাকা জনপ্রতি। একটি টিলার উপরে তৈরি করা পার্ক। বেশি বড় নয়। একটি ওয়াচ টাওয়ার আছে। সেখানে দাঁড়িয়ে চারিদিকের পাহাড় দেখা যায়। তার সামনে একটি বড় বাধানো যায়গা, মাঝে জলের ফোয়ারা করা আছে, কিন্তু আমরা ফোয়ারা চলতে দেখিনি, নীচে জলও দেখিনি।

Hill View park, Daringbari
Hill View park, Daringbari

আছে বাচ্চাদের জন্যে বানিয়া রাখা জিরাফ, বাঘ, অনেক দোলনা এনং স্লিপ। বাচ্চারা এখানে মনের আনন্দে ছুটে বেড়িয়ে ওয়াচ টাওয়ারে উঠে অনেক সময় কাটিয়ে দিতে পারে।

আজকের যাত্রা এখানেই শেষ। কাজেই আপনিও সময় কাটান যেমন ইচ্ছা। দোল খেয়ে বা পাহাড় দেখে, এবং অবশ্যই ছবি তুলে। তবে বলে রাখি, অনেক যায়গায় নেট নেই। সাথে সাথে ফেসবুক বা সোস্যাল মিডিয়ায় ছাড়তে পারবেন না। দেখা শেষ হলে আবার গাড়িতে করে সন্ধ্যা বেলা চলে আসুন হোটেলে।

হোটেল গুলো বেশিরভাগই শহরের বা বাজারের মধ্যে বা কাছাকাছি। ইচ্ছা হলে আজও একবার বাজার ঘুরে নিন। আগামীকাল সকালেই বেরিয়ে চলে যেতে হবে, তাই আর সময় পাবেন না। হোটেলে এসে গল্প আর খাওয়া আর বিশ্রাম। রাতে ঘুমিয়ে পরের দিনের জন্যে শরীরকে ঠিক রাখা।

বলে রাখি, হোটেল বা ক্যান্টিনগুলোর হাইজিন ও খাবার ভাল নয়। যারা যান, তাদের বেশিরভাগেরই পেট খারাপ হয়। তাই কম খাবেন, দেখে খাবেন, চেখে খাবেন।

তৃতীয় ও শেষ দিনঃ

বেরিয়ে পড়তে হবে সকালে, কারণ অনেক পথ যেতে হবে। ২০০ কিলোমিটারের বেশি। সকাল সাতটায় বেরোনোই ভাল। প্রথমে মিদুবান্দা জলপ্রপাত।

১২। মিদুবান্দা জলপ্রপাতঃ

Midubanda Waterfall, Daringbari
Midubanda Waterfall, Daringbari

দাড়িংবাড়ি থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরত্বে। সমতল থেকে অনেকখানি নীচে নেমে যেতে হয়। বাধানো সিঁড়ি আছে। কোনও যায়গা সমতল আবার কোথাও সিঁড়ি নেই। খুব বড় এলাকা জুড়ে নয়, একটি মাত্র প্রপাত। তবে বেশ জোর আছে জলের, আর শব্দও খুব। দূর থেকেই শোনা যায় জলের শব্দ। এখানে কিছুক্ষণ কাটিয়ে, ছবি তুলে আবার গাড়িতে ওঠা। এবার গন্তব্য খাসাদা।

১৩। খাসাদা জলপ্রপাতঃ

Khasada Waterfall, Daringbari
Khasada Waterfall, Daringbari

মিদুবান্দা থেকে অনেকটাই দূরে। প্রায় ৯০ কিলোমিটার। সময় লাগবে কম-বেশি আড়াই ঘন্টা। রাস্তা ভালোই, এবং ফাঁকা। আসলে যারা দাড়িংবাড়ি আসে কাশ্মীর দেখবে বলে, তারা হতাশ হয়। কিন্তু দাড়িংবাড়িতে কিছু না থাকলেও এই নির্জন ফাঁকা রাস্তা দিয়ে কখনও কখনও টিলা পাহাড়ের গা ঘেষে ভুট্টা ক্ষেত দেখতে দেখতে চলারও একটা আনন্দ আছে। এই রাস্তার পাশে, বিশেষতঃ খাসাদার কাছাকাছি অনেক সমতল ভূমি আছে, যেখানে প্রচুর ভুট্টা চাষ হয়। এক সময় পৌঁছে যাবেন খাসাদা জলপ্রপাত। একে জলপ্রপাত না বলে পাহাড়ি নদী বলা ভাল। কোথাও খুব উঁচু থেকে জল পড়ছে না। পাথরের উপর দিয়ে উঁচু থেকে নীচুতে বয়ে গেছে জল। স্রোত আছে, শব্দ আছে। অনেকেই এখানে স্নান করে, এমনকি পর্যটকরাও। নদীর ওপারে আছে নাকি রামমন্দির। নদীর জল কম থাকলে বা না থাকলে পাথরের উপর দিয়ে সোজা যাওয়া যায়। আমরা যেতে পারিনি, দেখতেও পারিনি। এখানে কিছুক্ষণ কাটিয়ে চলে যান জিরাঙ্গা বৌদ্ধিক মনাস্ট্রিতে।

১৪। জিরাঙ্গা বৌদ্ধিক মনাস্ট্রিঃ

Jiranga Monastery
Jiranga Monastery

খাসাদা থেকে ৮ কিলোমিটার। কোথাও লেখা Jeerango/Jirang/Jiranga. উচ্চারণ যাই হোক, বেশ বড় বৌদ্ধিক মনাস্ট্রি এটি। উড়িষ্যার গজপতি জেলায়। খাতা কলমে নাম ‘পদ্মসম্ভবা মহাবীর মনাস্ট্রি’। পূর্ব ভারতে এটাই সবচেয়ে বড় মনাস্ট্রি। ২০১০ সালে দলাই লামা এটির উদ্বোধন করেন। এর একটি ইতিহাস আছে। ১৯৫৯ সালে প্রায় ৮০,০০০ তিব্বতী রিফিউজি ভারতে আশ্রয় নেয়। তাদের অনেককেই উড়িষ্যার চন্দ্রগিরি এলাকার ক্যাম্পে রাখা হয়। ক্রমে তারা এখানে বসতি স্থাপন করে। তারা এই স্থানের নাম দেয় ‘Phuntsokling’ মানে সুখের যায়গা। ১৯৯৮ সালে দলাই লামা এখানে মনাস্ট্রি স্থাপনের অনুমতি দেয়, ২০০৩ থেকে ২০০৮ সাল, এই পাঁচ বছর ধরে ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে এটি তৈরি হয়। মোট একালা ১০ একর। মনাস্ট্রি পাঁচতলা, ৭০ ফুট উঁচু।

এখানকার বুদ্ধ মূর্ত্তিও বেশ বড়। ২৩ ফুট উঁচু। ২০০ লামা থাকে এখানে। পাশেই আছে একটি বড় লেক। আছে ঘন্টা ঘর, লামাদের থাকার জায়গা বা হোস্টেল, খাবার যায়গা। ছোট, বড় সব বয়সের লামাদের দেখা মেলে এখানে। এখানে অনেক সময় কাটানো যায়। তবে মন্দির খোলা ও বন্ধের সময় আছে। দুপুরে ১২ টায় বন্ধ হয়ে যায়, খোলে আবার একটায়। রাস্তায় আসতে আসতে অনেল বৌদ্ধদের বাড়ি দেখা যায়। এবার এখান থেকে যাওয়া তপ্তপানি বা গরম জলের কুপ দেখতে।

১৫। তপ্তপানিঃ

Taptapani
Taptapani

প্রাকৃতিক গরম জলের কুপ। নাম তপ্তপানি। এখানে মন্দির আছে, পূজা হয়। সালফার যুক্ত গরম জল লোকের চর্মরোগও সারিয়ে দেয়। এই মন্দিরের নাম কানধুনী দেবী (Kandhuni Devi) মন্দির। একটি এলাকা জুড়ে ঘিরে রাখা হয়েছে লোকের নীচে নেমে জল নেবার জন্যে।

এখানে এ ছাড়াও একটি সরম জলের ছোট ঝোরা আছে। সেখানেও ভাল লাগবে। হাতে যেমন সময় থাকবে, তামনি ভাবে সময় কাটিয়ে আবার যাত্রা শুরু।

১৬। ডিয়ার পার্ক, তপ্তপানিঃ

Deer Park, Taptapani
Deer Park, Taptapani

একেবারেই কাছে আছে ডিয়ার পার্ক বা হরিনের চিড়িয়াখানা। তবে এখানে শুধু হরিন থাকে না, অন্য জীবজন্তুও থাকে। এমনকি উটপাখীও আছে। হাতের সময় অনুযায়ী এখানে সময় কাটানো যায়।

এবার ঘোরা শেষ। এখান থেকে ৫৫ কিলোমিটার দূরে ব্রাহ্মপূর রেল স্টেশান। দেড় ঘন্টা মত সময় লাগবে। তারপর ট্রেনের সময় আনুযায়ী বাড়ি ফেরার পালা।

আবার বলছি, এখান থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে গোপালপুর-অন-সি। সময় থাকলে আরো দু’দিন থেকে গোপালপুর, চিল্কা, রম্ভা দেখেও ঘরে ফেরা যায়।

দরকারি কথা অথবা সতর্কতাঃ

  • ১। আপনি যদি দারিংবাড়ি গিয়ে কাশ্মীর দেখতে চান, হতাশ হবেন। বরফও পাবেন না। তবে ১৩০০ ফুট উঁচুতে গিয়ে শীতের সময় বেশ ঠান্ডা পাবেন।
  • ২। খাওয়া –দাওয়া সাবধানে করবেন। এখানে পেট খারাপের সম্ভাবনা অনেক।
  • ৩। হোটেলের সাথে কোন খাওয়ার চুক্তি করবেন না। তা হলে তারা যা দেবে, বাধ্য হয়ে খেতে হবে।
  • ৪। দারিংবাড়িতে বা কাছে সানসেট পয়েন্ট বা পার্ক ছাড়া তেমন কিছু নেই। সব গাড়ি নিয়ে ঘুরে দেখতে হবে। যতদিন ঘুরবেন, গাড়ি সাথে লাগবে।
  • ৫। হোটেল খুব বেশি নয়, সিজনের সময় আগে থেকে বুক করা ভাল।

করোনা পরবর্তী জীবনে সব মিলিয়ে খারাপ লাগবে না। তাই ঘুরে আসুন।

খরচাপাতিঃ

আট জনের জন্যে বোলেরো বা টাটা সুমো গাড়িই ভাল। হোটেলের মাধ্যমে গেলে ১১০০০-১২০০০ টাকা তিন দিনের জন্য। সব কিছু সহ। নিজেরা করলে ৮০০০ এর মধ্যেও হতে পারে।

হোটেল ভাড়াঃ ডাবল বেড, নন এ.সি. ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা, সিজনে। অন্য সময়ে কিছু কমে হবে। বেড বড় থেকলে ৩ জনও থাকা যায়।

খাওয়া খরচ- যেমন খাবেন। হোটেলের সাথে চুক্তি করলে সকালে ব্রেকফাস্ট, দুপুর ও রাতের খাবার, বিকেলে স্নাক্স ও সকাল-বিকেল চা মিলিয়ে নেবে ৪৫০ টাকা জনপ্রতি, প্রতিদিন। নিজেরা খেলে কমে হবে। খাবার আলাদা ক্যান্টিন আছে।

ঘোরার জন্যেঃ পার্কিং ফি, এন্ট্রি ফি ধরে জনপ্রতি আর ১০০ টাকা।

নিজেদের অন্যান্য খাওয়া খরচ, বাইরে এটা ওটা খেলে আরো ১০০ টাকা জনপ্রতি ধরুন।

ট্রেনের খরচ আলাদা।

এবার আপনি হিসাব করে নিন কেমন খরচ হতে পারে, কি খাবেন, কি ভাবে যাবেন।

বিস্তারিত দেখার জন্য ভিও দেখুন_ প্রথম পর্ব

ঘুরে আসুন দারিংবাড়ি। কাশ্মীর না হলেও ভাল লাগবে।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *